
শেষ আপডেট: 1 June 2022 14:33
অসংখ্য স্টেজলাইটের ঝলকানির নীচে তীব্র গরমে গাইছিলেন কেকে। বুধবার জনমানবহীন নজরুল মঞ্চে ঢুকে বোঝা গেল, এসি কাজ না করলে ২৪৮২টি সিট সম্পন্ন এই হল ঠিক কতটা গুমোট হতে পারে। ঢুকলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘেমেনেয়ে অস্থির হওয়ার জোগাড়। অথচ গতকাল তার মধ্যেই অনুষ্ঠান চলে। চলতেই থাকে।
তবে এসি কিন্তু বন্ধ বা খারাপ ছিল না। কেন্দ্রীয় ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিতই ছিল নজরুল মঞ্চ। জোরকদমেই চলছিল এসি। কিন্তু গতকাল অনুষ্ঠানের সময় প্রথম থেকেই ভিড়ের কারণে মঞ্চের সাতটা দরজাই খোলা ছিল। তাই এসি কাজ করেনি বলে দাবি কর্মীদের। এমনকি ভেঙে গিয়েছিল দু'টি দরজাও।

নজরুল মঞ্চের দায়িত্বে রয়েছে কেএমডিএ। তাদের তরফে মাত্র দু’জন নিরাপত্তারক্ষী কাজ করেন বলে জানা গেল। এত বড় হলে মাত্র দু’জন নিরাপত্তারক্ষী কেন, জানতে চাওয়ায় কর্মী চন্দন মাইতি বললেন, ‘দুটো গেটে, দু'জন থাকে। বাকি নিরাপত্তার ব্যবস্থা অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা করেন। কাল যতগুলো সিট, তাঁর দ্বিগুণেরও বেশি লোক হয়েছিল। নজরুল মঞ্চে এত লোক এর আগে কখনও হয়নি। আমি ১২ বছর ধরে কাজ করছি। এরকম মারামারিও হয়নি। ফসিলস ব্যান্ডের শো থাকলে একটু হইচই হয়। কিন্তু এত বিশৃঙ্খলা হয় না।’

এখনও নজরুল মঞ্চ চত্বরে কেকে-র শেষ অনুষ্ঠানের পাস পড়ে রয়েছে। তাঁতে লেখা, স্যার গুরুদাস কলেজ তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আয়োজিত উৎকর্ষ ২০২২। সভাপতি পঙ্কজ ঘোষ ও অধ্যক্ষ মণিশঙ্কর রায়ের নামও রয়েছে তাতে। বিভিন্ন গেট ও নানান অংশ দেখলে গতকালের পরিস্থিতির আঁচ মিলছে। ভিআইপি গেট ও তার সামনের রেলিং ভাঙা। চেয়ার ভাঙা। বিভিন্ন দেওয়ালের টাইলস ভেঙে ফেলা হয়েছে। তিন নম্বর গেটের কাছে দেওয়ালে লাগানো ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার খুলে স্প্রে করা হয়েছে হলে ঢোকার চেষ্টায় থাকা ছেলে–মেয়েদের ওপর! সাত নম্বর গেটের দরজাও ভাঙা হয়েছে। হলে ঢোকার কার্পেট ছিঁড়ে গিয়েছে।

নিরাপত্তারক্ষী তরুণ ভাণ্ডারী বললেন, ‘কলেজের তরফে ৩০ জন বাউন্সার ছিল। পুলিশও ছিল। একটা কলেজের ফেস্টে এসেছিল অনেকগুলো কলেজের ছেলে-মেয়ে। যেকারণেই সবার জায়গা হয়নি। ফলে গোলমাল শুরু হয়। নজরুল মঞ্চের এসি ভাল। অনেক সময়ে ঠান্ডা কমানোর জন্য অনেকে বলেন। কিন্তু কাল সব দরজা খোলা থাকায় ভেতর ঠান্ডা হয়নি। খুব গরম ছিল। অনুষ্ঠানের সময় চড়া আলোর নীচে গাইতে শিল্পীর খুব কষ্ট হচ্ছিল। বারবার এসি চলছে কিনা জানতে চাইছিলেন। অনেকদিন ধরে এখানে কাজ করছি। অনুষ্ঠান শেষে শিল্পীর মৃত্যু কোনও দিন শুনিনি।’

গতকালের শোয়ে গরমে বারবার ঘেমে ভিজে যাচ্ছিলেন কেকে। নিজের ভেজা শার্টও দর্শকদের দেখান। একবার কিছু সাইকেডেলিক লাইট বন্ধ করতে বলেন। জানা গেছে, শুধু শিল্পী নন, সঙ্গে যন্ত্রানুষঙ্গে থাকা শিল্পীদেরও গরমে কষ্ট হচ্ছিল। ১৫টি গান গাওয়ার পরে দশ মিনিটের বিরতি নেন কেকে। ঢোকেন সাজানো–গোছানো এসি আর্টিস্ট রুমে। সেখানে মিনিট দশেক ছিলেন তিনি। তার পর ফের মঞ্চে এসে গান শুরু করেন। শেষ গানের আগেই ভিআইপি গেটের পাশে তাঁর সঙ্গে সেলফি তোলার জন্য একটি জমায়েত হয়েছিল। কিন্তু কেকে অনুষ্ঠান শেষে আর থাকেননি একটুও। থাকতে পারেননি আসলে। স্টেজ থেকেই সোজা গাড়ির দিকে দৌড়ে চলে যান। ভিড় সামলায় সঙ্গে থাকা বাউন্সাররা। গাড়িতে উঠে হাত নেড়ে হোটেলের উদ্দেশে রওনা হন।

তৃণমূল ছাত্র পরিষদ সূত্রের খবর, ঘটনার সময়ে নজরুল মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য। তিনি থাকাকালীনই ওই গন্ডগোল শুরু হয়। অভিযোগ, তিনি ওই ঝামেলা থামানোর কোনও চেষ্টা করেননি। উত্তর কলকাতার বিভিন্ন কলেজের ছাত্র পরিষদের ছেলে-মেয়েরাই ভিড় করেছিল নজরুল মঞ্চে। অনেকেই জায়গা না পেয়ে স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখেছে। কেউ সিঁড়িতে বসে। আর যাঁদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি, তাঁদের সঙ্গে গেটে থাকা লোকজনের গোলমাল বেঁধে যায়। প্রশ্ন উঠছে, যে মঞ্চের ক্ষমতা ২৪৮১ জনকে জায়গা দেওয়ার, সেখানে অত পাস বিলি করা হল কেন?
‘ইয়ারোঁ…দোস্তি…’, ইস্কুলবাড়ির ফেয়ারওয়েলের গন্ধে আজীবন লেগে থাকবেন কেকে
স্যার গুরুদাস মহাবিদ্যালয়ের জিএস রাজেশ পাল বললেন, ‘আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। তাই পাসে আমার নামও নেই। এখন তৃণমূল ছাত্রপরিষদ চালায় সভাপতির তৈরি করে দেওয়া ইউনিট।’
পাশাপাশি তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ক’য়েকজনের দাবি, এসব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গোলমাল চলছে। কলেজের জিএস নয়, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তৃণাঙ্কুরের তৈরি ইউনিট। যে ইউনিটে কোনও পড়ুয়া নেই। আগের বিবেকানন্দ কলেজের ফেস্ট ছিল নজরুল মঞ্চেই। সেখানে কোনও ঝামেলা হয়নি। এদিনের ঝামেলা ভিড় বা বেশি পাস বিলির নয়, তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। বিষয়টিতে তৃণাঙ্কুরকে ফোন করা হলে, জানান, তিনি একটি চ্যানেলের টক শোয়ে রয়েছেন। পরে কথা বলবেন।

কলেজের অনুষ্ঠানে সাধারণত অনেকগুলিই গান করতেন কেকে। এদিনও কী গাইবেন তাঁর লিস্ট নিয়ে এসেছিলেন। তাতে ছিল তাঁর হিট ২০টি গান। গরমের কষ্ট সত্ত্বেও গাইছিলেন একের পর এক গান। তাঁর দেহ ইতিমধ্যেই মুম্বইয়ের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। কিন্তু জীবনের শেষ অনুষ্ঠানে গাওয়া গানের তালিকা এখনও পড়ে রয়েছে শ্রোতাহীন নিঝুম নজরুল মঞ্চের স্টেজে।

প্রচণ্ড গরমই কি প্রাণ কাড়ল? হিট স্ট্রোকের চেয়েও বড় ভয় হার্ট অ্যাটাক