দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘স্পুটনিক ভি’ ভ্যাকসিনের ঠিকমতো ট্রায়ালই হয়নি। রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই কীভাবে মানুষের শরীরে টিকা দিলেন গবেষকরা? স্বাস্থ্যমন্ত্রকের এথিক্স কাউন্সিলের বিধি লঙ্ঘণ করেছে ভ্যাকসিন নির্মাতা সংস্থা গ্যামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব এপিডেমোলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি।। রুশ ভ্যাকসিন নিয়ে বড়সড় অভিযোগ তুললেন এথিক্স কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান পালমোনোলজিস্ট ডাক্তার আলেক্সান্ডার চুচালিন। সূত্রের খবর, এথিক্স কমিটি থেকে পদত্যাগও করেছেন তিনি।
রাশিয়ার ভ্যাকসিনের সুরক্ষা ও কার্যকারিতা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে আন্তর্জাতিক মহলে। প্রথম পর্যায়ে মাত্র ৭৬ জনের শরীরে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করেই কীভাবে ভ্যাকসিন নিয়ে আসার কথা বলছে রাশিয়া, এই নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে নানা মহলেই। টিকার সুরক্ষাবিধিতেই এবার বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন খোদ রাশিয়ারই অভিজ্ঞ ডাক্তার এবং এথিক্স কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান ডক্টর আলেক্সান্ডার।
মানুষের শরীরে টিকা প্রয়োগের আগে তার সেফটি ট্রায়ালের রিপোর্ট দেখেই রেজিস্ট্রেশনের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। এথিক্স কাউন্সিলের কাছে সেই রিপোর্ট জমা করতে হয়। ভাইরোলজিস্ট ও অভিজ্ঞ ডাক্তাররা সেই রিপোর্ট খতিয়ে দেখে তবেই মানুষের শরীরে টিকা দেওয়ার অনুমতি দেন। আলেক্সান্ডারের বক্তব্য, গ্যামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট সেফটি ট্রায়ালের ডেটা জমা তো করেইনি, উল্টে রেজিস্ট্রেশনের অনুমতি ছাড়াই মানুষের শরীরে টিকার প্রয়োগ করেছে। এথিক্স কাউন্সিলের নিয়মনীতি পুরোপুরি লঙ্ঘণ করা হয়েছে।
ডাক্তার আলেক্সান্ডারের অভিযোগ, ভ্যাকসিন তৈরি ও তার ট্রায়ালের দায়িত্বে থাকা প্রধান দু’জন এই নিয়ম ভেঙে বেআইনিভাবে টিকার প্রয়োগ করেছেন। তাঁরা হলেন গ্যামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ভাইরোলজিস্ট আলেক্সান্ডার গিন্টসবার্গ এবং রুশ সেনার মুখ্য ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক সার্গে বোরিসেভিক। “আমি মর্মাহত কীভাবে দু’জন অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী এমনভাবে নিয়ম ভাঙতে পারলেন। যাঁদের উপরেই দায়িত্ব ছিল তাঁরাই নির্বোধের মতো কাজ করেছেন। এটা কখনওই উচিত হয়নি,” অভিযোগ ডাক্তার আলেক্সান্ডারের।
রাশিয়ার ভ্যাকসিন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছে আমেরিকাই। মার্কিন এপিডেমোলজিস্ট ও হোয়াইট হাউসের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা অ্যান্থনি ফৌজি বলেছিলেন, “রাশিয়া ও চিন ভ্যাকসিনের পরীক্ষাই করছে বলে আমি মনে করি। এত কম সময় মাত্র একটাই ট্রায়ালে টিকা নিয়ে আসা সম্ভব নয়। ” রাশিয়া ও চিনের ভ্যাকসিন বাজারে এলেও তার প্রয়োগ করবে না বলেই সাফ জানিয়ে দেয় আমেরিকা।
১৮ জুন থেকে টিকার ট্রায়াল শুরু করে গ্যামেলিয়া। ৭৬ জন স্বেচ্ছাসেবককে দুটি দলে ভাগ করে টিকা দেওয়া হয়। প্রথম ৩৮ জনকে লিকুইন ভ্যাকসিন ইনজেক্ট করা হয়, বাকি ৩৮ জনকে টিকার পাওডার দেওয়া হয়। রাশিয়ার ক্লিনিকাল ট্রায়াল অর্গানাইজেশনের ডিরেক্টর ভেতলানা জ়্যাভিডোভা বলেছেন, একসঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল করা হয়েছে ভ্যাকসিনের। দাবি, দুই পর্যায়তেই সাফল্য মিলেছে। স্বেচ্ছাসেবকদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে শুরু করেছে। তবে রাশিয়ার দাবিতে বরাবরই আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের দাবি, রাশিয়া কেবলমাত্র একটাই পর্যায়ের ট্রায়াল করেছে। একশোর কম জনকে ভ্যাকসিন দিয়ে তার কার্যকারিতা প্রমাণ করা যায় না। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে কয়েক হাজার জনকে টিকা দিয়ে তার প্রভাব লক্ষ্য করেই সিদ্ধান্তে আসা যায়। বয়স্ক ও শিশুদের শরীরে ভ্যাকসিনের প্রভাব কেমন হবে সেটা এখনও জানা যায়নি। হু-র আরও দাবি করে, টিকা কীভাবে তৈরি হয়েছে সেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সবিস্তারে জানায়নি রাশিয়া। পাশাপাশি, ল্যাবরেটরিতে প্রিক্লিনিকাল ট্রায়ালের ফলাফল এবং প্রথম পর্যায়ের টিকার ট্রায়ালের রেজাল্টও সামনে আনা হয়নি।
ডাক্তার আলেক্সান্ডারের বক্তব্য, করোনা টিকার প্রতিটি পর্যায়ের ট্রায়ালের গুরুত্ব রয়েছে। প্রথম দুই স্তর শুধুমাত্র মানুষের শরীরে টিকার সুরক্ষার বিষয়টা নিশ্চিত করে, তৃতীয় স্তরে দশ হাজারের বেশি জনকে টিকা দিয়ে দেখা হয় সার্বিকভাবে এর প্রয়োগ সম্ভব কিনা। এই স্তরে সব বয়সের মানুষের উপর টিকার ট্রায়াল হয়। তারপরেই টিকা বাজারে আনা যাবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গ্যামেলিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজিস্টরা এতগুলো স্তর পার হননি এখনও, তার আগেই টিকা নিয়ে আসার ঘোষণা করে ফেলেছেন।