জেলের আঁধার পেরিয়ে জীবনের আলোয়, খুনের আসামি এখন সেলুন চালান
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাস্তার উপরেই একটেরে ছোট্ট ঘর। বাইরে সাইনবোর্ডে বড় বড় হরফে লেখা সেলুনের নাম ‘মারুমালারচি’। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় নবজন্ম। ভিতরে জনা কয়েক লোক। অপেক্ষারত। দেওয়ালের একধারে সার বেধে রাখা আয়নার সামনে বসে চুল কাটাচ্ছেন এক যুবক।
শেষ আপডেট: 7 April 2019 18:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাস্তার উপরেই একটেরে ছোট্ট ঘর। বাইরে সাইনবোর্ডে বড় বড় হরফে লেখা সেলুনের নাম ‘মারুমালারচি’। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় নবজন্ম। ভিতরে জনা কয়েক লোক। অপেক্ষারত। দেওয়ালের একধারে সার বেধে রাখা আয়নার সামনে বসে চুল কাটাচ্ছেন এক যুবক। চুলের ছাঁট কেমন হবে তার বিবরণ দিতে দিতেই নাপিতের সঙ্গে চলছে আড্ডা। এক হাতে কাঁচি আর অন্য হাতে নানা মাপের চিরুনি বদলে বদলে দক্ষ হাতে যুবকের চুলের ফ্যাশনেবল কাটে ব্যস্ত নাপিত। যুবক উঠে গেলে এক বৃদ্ধের পালা। তার সঙ্গেও খোশমেজাজে চলছে আড্ডা।
যে কোনও সেলুনেরই এটাই পরিচিত ছবি। তবে কন্যাকুমারীর নাগেরকয়েলের এই সেলুনের গল্প কিছু আলাদা। সেলুনটিতে যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা নয়, সাধারণ ছাপোষা সেলুন। বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেলুনের নাপিতের মধ্যে। অতি সাধারণ চেহারার এই যুবকের একটা আলাদা পরিচয় রয়েছে। যদিও নিজের নাম জানাতে চান না তিনি, তবে নিজের অতীত নিয়ে খুব একটা রাখঢাক নেই তাঁর। ওই অঞ্চলের বাসিন্দারা সকলেই প্রায় এটা জানেন। যাঁরা নতুন তাঁদেরকেও নিজের জীবনের গল্প শোনাতে ভোলেন না যুবক। মুখে মুখে কথা ছড়িয়ে এই সেলুন এবং তার নাপিত তাই এখন বেশ পরিচিত।
১৯ বছর আগের দিনটা আর মনে করতে চান না মুরুগান (নাম পরিবর্তিত)। নিজের প্রিয় বন্ধুকে খুনের দায় চাপে তাঁর উপর। যদিও খুনের দাবি এখনও অস্বীকার করেন তিনি। মুরুগানের কথায়, ‘‘খুনের অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছিল আমাকে আর আমার পরিবারের ছ’জনকে। আমার দুই দাদা, শ্বশুর, কাকাদের সঙ্গে আমাকেও যাবজ্জীবনের সাজা শোনানো হয়।’’
পালামকোট্টাইয়ের জেলে জীবনের ১৭টা বছর কাটে মুরুগানের। তবে জেলবন্দি দশায় তিনি শুধু অতীত হাতড়ে আর আফশোস করে কাটাননি। যুবক জানিয়েছেন, ‘‘নাপিতের কাজ কিছুটা জানতাম। সেটাকে সম্বল করে জেলেই নতুন ভাবে বাঁচার চেষ্টা শুরু করি।’’ তাঁর কথায়, ‘‘সহ-বন্দিদের চুল-দাড়ি কাটতে শুরু করি। তাদের চুলের ছাঁট দেখে উৎসাহ পান জেলের কর্মীরাও। আমার নাম হয়। একে একে জেলের অফিসাররাও আমার কাছে চুল কাটাতে শুরু করেন।’’ দিনে ২০-২৫ জনের চুল-দাড়ি কাটতেন তিনি।

পুলিশ কর্তাদের তাঁর হাতের কাজ নাকি খুবই পছন্দের ছিল, এমনটাই জানিয়েছেন মুরুগান। ২০১৮ সালের অক্টোবরে ছাড়া পাওয়ার পর শুরু হয় তাঁর জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। মুরুগান বলেছেন, খুনের আসামি মানেই তাঁকে বাঁকা চোখে দেখে গ্রামের লোকজন। তাঁর ক্ষেত্রেও সেটার ব্যতিক্রম হয়নি। যে কালিমা তার চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, তাকে নিয়ে অপরাধবোধে না ভুগে বরং আলোর পথে পা বাড়াবার কথাই ভাবেন তিনি। ‘‘১৭ বছর আগে আমার একটা পরিচয় ছিল। এখন তাতে দাগ লেগেছে। তবে আমি হার মানিনি। নতুন করে শুরু করেছি। আমার নবজন্ম হয়েছে।’’ নিজের সেলুনের নামও তাই রেখেছেন সে ভাবেই।
মুরুগানের পরিবারে এখন চার জন সদস্য। জানিয়েছেন, সেলুন শুরু করতে দরকার ছিল প্রায় ৫০,০০০ টাকা। তার কিছুটা আসে জেলের রোজগার থেকে, কিছুটা ধারদেনা করে আর বাকিটা মাদুরাইয়ের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাহায্যে। সংশোধনাগার থেকে বার হওয়া কয়েদীদের জীবনের মূলধারায় ফেরানোর জন্য এই সংগঠনের হয়ে কাজ করেন কেআর রাজা। তিনিই মুরুগানকে নতুন জীবনের আলো দেখান। তা ছাড়াও মুরুগানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন বেঙ্গালুরুর একটি সমাজসেবা মূলক প্রতিষ্ঠানের আধিকারিক শ্রীরাম পন্নুস্বামী এবং দীনেশ তারেপাল্লী ও বিজয়েশ্বরী মুরুগানান্তম নামে দুই প্রবাসী ভারতীয়।
‘‘সেলুন তৈরির আগে নানা রকম কাজ করেছি। এখন এটাই আমার পেশা। সুন্দর ভাবে জীবনটা কাটাতে চাই, ’’ হাসি মুখে জানিয়েছেন গর্বিত মুরুগান।