আকাশ ঘোষ
ঢাক (Dhak) বাজিয়ে সারা বছর সংসার চলে না। বাংলার গ্রামগঞ্জের ঢাকিদের বছরভর চাষের লাঙলই ভরসা। কিন্তু তার মধ্যেও মাসের পর মাস আগমনীর অপেক্ষায় কেটে যায় তাঁদের। আকাশে বাতাসে শরতের ছোঁয়া লাগলেই তাঁদের মন নেচে ওঠে। পুজোর পাঁচদিন মন ভরে মনের মতো কাজটা করতে পারেন তাঁরা। মা দুর্গার সামনে দাঁড়িয়ে আলো ঝলমলে শহরে ঢাক বাজান।
কিন্তু এবছর পরিস্থিতি পালটে গেছে। না আছে আগের মতো শহর, না আছে তার পুজোর আনন্দ। সবটাই মাটি করেছে করোনা। কোভিডের কারণে এবছরও পুজোয় একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে হাইকোর্ট। মণ্ডপের ভিতরে দর্শকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা মানতে হবে। ঢাকিদেরও ভিতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। সবচেয়ে বড় কথা, কোভিডের চক্করে পুজোর বাজেট অনেক কমিয়ে দিয়েছে ক্লাবগুলো। ফলে কোপ পড়েছে ঢাকিদের পারিশ্রমিকেও। পুজো আর আগের মতো দেখছেন না ঢাকবাদকরা। নেই সেই উন্মাদনাও।
শাহরুখকে ছেঁটে ফেলল অনলাইন শিক্ষাদানকারী সংস্থা, আরিয়ান কাণ্ডের জের
পুজোর ঢাকে কাঠি পড়তে আর দু'দিন বাকি। প্রতি বছরের মতোই এবারেও শিয়ালদহ স্টেশনে এসে ভিড় জমিয়েছেন ঢাকিরা। অপেক্ষা বায়নার। তবে সেখানেই মার খাচ্ছেন তাঁরা। কারণ পছন্দমতো বাজেট তো দূরের কথা, সামান্য বাজেটেও বায়না মিলছে না অনেকের। আশার পারদ নামতে নামতে একেবারে তলানিতে ঠেকেছে।
শুধু তো কোভিড নয়, বছর মারণ কামড় বসিয়েছে বন্যা। বর্ষার শুরু থেকেই এবার দাপিয়ে ব্যাটিং করেছে বৃষ্টি। তার উপর ডিভিসি জল ছাড়ায় প্লাবিত হয়েছে দক্ষিণবাংলার একাধিক জেলা। জলের তলায় গ্রামের পর গ্রাম। বন্যায় সর্বস্ব হারিয়েছেন ঢাকিরাও। কোনও মতে বাঁচিয়ে রেখেছেন জীবন ধারণের একমাত্র অবলম্বন ঢাকগুলোকে। এই প্লাবন বিপর্যয়ের পর পুজোকেই একটু আশার প্রদীপ হিসেবে দেখছিলেন তাঁরা। তবে শহরে এসে যারপরনাই হতাশ হয়েছেন।
পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া থেকে কুড়ি জনের দল নিয়ে এসেছেন পিন্টু দাস। বন্যার সময় তাঁদের অবস্থা হয়েছিল তথৈবচ। টাকা-পয়সা তো দূর, মাথার উপর ছাদটুকুও নেই। ছেলেমেয়েদের পুজোর জামা-কাপড় কিনে দেওয়া তাঁর কাছে নিতান্ত বিলাসিতা। প্রশ্ন শুনেই বলে উঠলেন, "কোথায় পাব জামা-কাপড়? নিজের পেটে আহার জোটে না, জামা-কাপড় কোথায় পাব?" তিনিই জানালেন এবার ঢাকেরা বাজার দর আগের চেয়ে কতটা পড়ে গেছে। কোভিড আবহে গতবারও এসেছিলেন তিনি। তবে বলছেন এবার যেন গতবারের চেয়েও বাজার খারাপ। যেখানে আগের বার একটি ঢাকের দর ছিল ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা, এবার সেটাই ঠেকেছে ৬ থেকে ৭ হাজারে। কখনও নেমে যাচ্ছে ৫ হাজারেও। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাও নিজেদের করে নিতে হচ্ছে ঢাকিদের।

বাঁকুড়ার ইন্দাস থেকে কলকাতায় বায়নার আশায় এসেছেন মন্টু রুইদার। তিনিও বাকিদের সুরেই সুর মেলাচ্ছেন। দশ জনের দল নিয়ে কলকাতায় পা রাখা ইস্তক ঢাকের বায়না খুঁজেছেন হন্যে হয়ে। জুটেও গেছে, তবে বাজার খারাপ। যা চেয়েছিলেন, পাননি।
একই অবস্থা বীরভূমের পরেশ দাসেরও। এক এক জনের মাথা পিছু ১৫০০ টাকা করে দর রেখেছেন তাঁরা, যা ন্যূনতম। তবে সেটুকুও জুটছে না।
ক্লাস সিক্সের ছাত্র রাকেশ দাস বড়দের সঙ্গে ঢাক বাজাতে এসেছে পূর্ব বর্ধমান থেকে। বাঁশি বাজাতে ভালই জানে সে। কীর্তনে নামও আছে বেশ। সেই রাকেশ শিখে নিচ্ছে ঢাকটাও। তবে শিয়ালদহ স্টেশনে বসে সে শোনালো বন্যার ভয়াল টাটকা স্মৃতি। গাছের ডালে ঢাক ঝুলিয়ে রেখে কোনওমতে জল থেকে তা বাঁচিয়েছে ছোট্ট রাকেশ। বন্যার সময় খাবার হিসেবে গাছের পাতা ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। গ্রামের বড়দের সঙ্গে সেও পুজোর কলকাতায় এসেছে বায়নার আশায়। পুজোর নতুন জামা হয়নি একটাও।
ব্যারাকপুর থেকে সমর দাস এসেছেন পাড়ার ক্লাবের জন্য ঢাকি খুঁজতে। বাজেট কম, তিনি বলছেন যা দাম দেওয়া হচ্ছে ঠিকই আছে। এই বাজারে চার-পাঁচ হাজার টাকাই অনেক। কেউ কেউ তার থেকেও কমাতে চাইছেন। শুনে সমরবাবু বললেন সেটা উচিত নয়। আমরা যেমন পুজোর আনন্দের জন্য বসে থাকি এরাও তেমন এই টাকাটুকুর জন্য বসে থাকে।
বারাসাতের ক্লাব থেকে ঢাকি খুঁজতে এসেছেন দেবাশিস বিশ্বাস। ঢাকিদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা তাঁরা করবেন না কোভিডের কারণে। বাজেটের মধ্যে ঢাকি পেতে ৪৫ মিনিট ধরে শিয়ালদহে ঘুরে ঘুরে দরাদরি করেছেন তিনি। শেষমেশ মিলেওছে। বাজেট আগের থেকে অনেকটাই কম। বাজার ভাল নয়।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'