.webp)
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
শেষ আপডেট: 22 May 2024 13:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রতিটি ভোটপ্রচারের জনসভায় তাঁর আমলে দেশের উন্নয়ন নিয়ে গলা ফাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর তা ফলাও করে প্রকাশ হচ্ছে টিভি চ্যানেল ও খবরের কাগজগুলিতে। কিন্তু, গত ১০ বছরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের মুক্তকণ্ঠের কী অবস্থা হয়েছে? একটি দুটি নয়, বেশ কয়েকটি দেশি-বিদেশি সমীক্ষা রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোদী জমানায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বহুলাংশে খর্ব হয়েছে। এখানে জোর গলায় কেন্দ্রবিরোধী বা শাসকদল বিরোধী খবরে যে কোনও পদ্ধতিতে কাঁচি চালিয়েছে মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি।
সিএনএন ওয়ার্ল্ড-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতের সরকার জনপ্রিয় নেতার দ্বারা পরিচালিত হলেও তিনি বিভাজনবাদী। প্রধানমন্ত্রীর পদে বসার পর থেকে গত ১০ বছরে একটিও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। বিরোধীদের লাগাতর অভিযোগ, গণমাধ্যমের বহুত্ববাদকে দমন করে রেখেছেন। এবং বিরোধী কণ্ঠের সাংবাদিকদের উপর দেশদ্রোহ, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ এসব অভিযোগে তাঁদের মুখ বন্ধ করা হয়েছে। দৃষ্টান্ত দিয়ে সিদ্দিক কাপ্পানের কথাও তুলে ধরা হয়েছে নিবন্ধে।
এই অবস্থায় মোদী এবং তাঁর দল যখন আরও পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসার দাবি জানাচ্ছে, তখন সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার উপর দীর্ঘ প্রশ্নচিহ্ন খাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে নিবন্ধের মত। সিএনএনকে কাপ্পান বলেছেন, এখন কোনও কিছু লেখার আগে কয়েকশো বার ভাবি, যে কোনও সময়, দেশের যে কোনও প্রান্তে, যে কেউ আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। এই ভয় ও আতঙ্কের কালো মেঘ ছড়িয়ে রয়েছে ভারতের গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের উপরে।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম-এর ২০২৩ সালের মানকাঠিতে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৬১ নম্বরে। এই অবনমন ঘটেছে ২০১৪ সালে মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের পর থেকে। এই তালিকায় ভারতের উপরে রয়েছে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানও। শুধু প্রতিবেশী বাংলাদেশ ভারতের পিছনে রয়েছে।
২০২০ সালে হাথরাস কাণ্ডের প্রথম সংবাদ প্রকাশের জন্য সিদ্দিক কাপ্পানকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে অর্থ তছরুপের অভিযোগে ২৮ মাস জেল খাটতে হয়েছিল। কাপ্পান বলেন, জামিনে মুক্তির পর একটি সাংবাদিকের চাকরির জন্য তাঁকে দোরে দোরে ঘুরতে হচ্ছে। কারণ বিজ্ঞাপন আটকে যাওয়ার ভয়ে কোনও সংবাদ মাধ্যমই তাঁকে কাজ দিচ্ছে না। তাঁর কথায়, কেউই সরকারকে চটাতে চায় না।
কাপ্পানের এই অবস্থা দেখে সাংবাদিক মহলে একটা হাড়হিম করা আতঙ্কের চোরাস্রোত বয়ে চলেছে। সবাই নিজেকে সরকারের নেকনজরে রাখার চেষ্টায় রয়েছে। কৌশিক রাজ বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থায় লেখালেখি করেন। তাঁর বিষয় হচ্ছে ঘৃণা-বিদ্বেষজনিত অপরাধ। কৌশিক জানালেন, কাপ্পানের কথা ভেবে আমিও ভয়ে আছি।
ভারত হল মিডিয়া বাজারের অন্যতম বৃহৎ দেশ। প্যারিসস্থিত রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে কমবেশি ২০ হাজার দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এবং ৪৫০টি বেসরকারি মালিকানার চ্যানেল রয়েছে। বহুভাষিক ও স্থানীয় চ্যানেলও শুধু সংবাদ উপস্থাপন করে এমনও গণমাধ্যম রয়েছে ভারতে।
তা সত্ত্বেও সমালোচক ও মিডিয়া গবেষকদের মতে, এত বড় সংবাদ জগৎ হওয়া সত্ত্বেও ভারতে মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি দিনদিন দ্রুত গতিতে মোদী সরকারের পরাধীন হয়ে চলেছে। লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের মিডিয়া, কালচার এবং সোশ্যাল চেঞ্জ বিষয়ের অধ্যাপক শকুন্তলা বানাজির মতে, ভারতের সংবাদ জগতে সরকারি পরিষেবা, জনস্বার্থ এবং বেসরকারি কর্পোরেট মিডিয়ার একটা মিশেল রয়েছে। তাদের সব কিছু আছে। কিন্তু গত ১০ বছরে সবটাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
প্যারিসের ওই সংস্থার তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভারতের সংবাদ জগতে স্বাধীনতার মান ২৫টি দেশের নীচে চলে গিয়েছে। এ প্রসঙ্গে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট সংগঠনের ভারতের প্রতিনিধি কুণাল মজুমদার সিএনএনকে বলেন, ১০ বছরে এটা খুবই খারাপ অবনমন। তিনি আরও বলেন, এর মূল কারণ হল সাংবাদিকদের মধ্যে জেল খাটা এবং সন্ত্রাসবাদী আইন কার্যকর করে তাঁদের অপরাধীর কাঠগড়ায় খাঁড়া করার ভয় ঢুকে রয়েছে।
সিপিজে দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেছে, ২০০৪-২০১৩ সাল পর্যন্ত ১৭ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ২০১৪-২০২৩ সাল পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন ২১ সাংবাদিক। বিশেষত সন্ত্রাস দমন আইনে সরকার ১৮০ দিন পর্যন্ত সাংবাদিকদের আটক রাখার ক্ষমতা অর্জন করায় সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
ভারতের প্রখ্যাত জানিমানি সাংবাদিক রভীশ কুমার বলেন, অনেক বছর ধরেই তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করেন না। কারণ, বিভিন্ন হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন তাঁকে অনবরত হেনস্তা এমনকী খুনের ভয় দেখিয়ে চলেছে। শকুন্তলার মতে, এটা এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের উদাহরণ হতে পারে।
সিএনএনের ওই নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, এটা শুধু দেশীয় সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে হচ্ছে, এমনটা নয়। সম্প্রতি অস্ট্রেলীয় ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো চিফ অবনী ডায়াসকে ভারত ছাড়তে হয়েছে। যেমনটা হয়েছে, ভ্যানেসা ডগনাককে। তিনি চারটি ফরাসি প্রকাশনা সংস্থার ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। ডায়াসকে বলা হয়েছিল, তাঁর ভিসার মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। কারণ তিনি সীমা অতিক্রম করে ভারত বিরোধী খবর লিখছেন। ২৩ বছর ভারতে সাংবাদিকতা করা ডগনাককেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি ভারতের উপরে নেতিবাচক কথাবার্তা লিখতেন বলে অভিযোগ। তাঁরও ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করেনি অমিত শাহের মন্ত্রক। বিবিসির দফতরে আয়কর অভিযানের কথা তো সবাই জানেন। এই অবস্থায় অনেকের মধ্যেই ভ্রু কুঁচকে রয়েছে, মোদী ফের ক্ষমতায় এলে কী হবে? আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলিক মালিকানা আপাতত মোদী-শাহ ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের কবজায়। তাই কার্যত সরকারপোষিত গণমাধ্যমের স্বাধীন কাজ করা এই অবস্থায় প্রায় অসম্ভব।